ফিওনার মেজাজ বেশ গরম। এতো সুন্দর করে সেজেগুজে সামির পাশে বসে ছিলো, কিন্তু কোনো মন্তব্য করল না। সে ভাবছে ছেলেটা এতো কেয়ারলেস কেন? এ যুগের বয়ফ্রেন্ডদের অনেক রোমান্টিক হতে হয়। প্রিয়তমার বিড়ালের অসুখ হলেও বলতে হয় 'ব্যাবি তোমার বিড়ালের অসুখ করেছে, ইস আমার জানটা কতো কষ্ট পাচ্ছে, অসুখ গুলো না এত্তো গুলো পঁচা'। ফিওনা ভাবছে ছেলেটাকে একটু টাইটে আনতে হবে।
সামি এতো এতো বই পড়ে জেনেছে মেয়েদের নাকি শপিং করতে অনেক সময় লাগে, কিন্তু তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। ফিওনার খুব বেশী সময় লাগেনি। তারা এখন বসে আছে শপিং সিটির একটা রেস্টুরেন্টে। যার নাম 'ক্যাফে ব্লু'...
ফিওনা সামিকে বললো ওয়ার্ডার করতে। সে ওয়েটারকে বললো, দুটো কলড্রিংস দাও।
ফিওনা বললো, এই শীতের দিনে কলড্রিংস কেনো। ওয়েটার একটা কলড্রিংস আর একটা কফি দাও।
সামি বললো তাহলে দুইটাই কফি দাও।
ক্যাফে থেকে বেড়িয়ে রিকশায় উঠলো সামি আর ফিওনা, রিকশাওয়ালা সামির পূর্ব পরিচিত। রিকশাওয়ালার নাম মনির উদ্দিন। বাড়ি ময়মনসিংহের জামালপুর। মনির উদ্দিন রিকশা চালায় জিন্দাবাজার এলাকায়, থাকে মেডিকেল কলনিতে। কারো থাকে চায়ের নেশা, কারো পান বিড়ির নেশা, মনির উদ্দিনের নেশা হল কথা বলা। রিকশার সব যাত্রীর সাথেই ইনিয়ে বিনিয়ে গল্প করে মনিরুদ্দিন। সামির সাথে কথা বলা বেশ জমলেও ফিওনার সাথে জমছেনা।
আপা, আপনেরে আর ভাইরে খুব মানাইছে। ভাইরে কতদিন কইছি, আপনেরে লইয়া আমার রিস্কা দিয়া ঘুরতে। ভাই কইতো, সব হইবো মনির ভাই সব হইবো।
ফিওনা কোনো উত্তর দিলো না। মনির উদ্দিন একাই বকবক করে গেলো। রিকশা ফিওনার বাসার সামনে থামলো। অন্য কেউ হলে গার্ল্ফ্রেন্ড এর রিকশা ভাড়াটা বয়ফ্রেন্ড নিজেই দিতো। কিন্তু ফিওনা জানে সামির কাছে কোনো টাকা নেই। ফিওনা ব্যাগ থেকে টাকা বের করে রিকশাওয়ালা মনির উদ্দিনকে দিতে চাইলেও মনির উদ্দিন নিলো না। সে বললো, আপা আপনে ভাইয়ের বান্ধবী, আপনের কাছ থাইকা টাকা নিলে কঠিন পাপ হইবো। আমি সারা জীবন গোলামি খাটলেও সামি ভাইয়ের ঋন শোধ হইতো না।
মনির উদ্দিনের চোখে একটু পানি এলো। ফিওনা বুঝলনা। সামির মতো একটা ভবগুরে ছেলের জন্য মনির উদ্দিনের মতো একজন রিকশা চালকের কেনো এতো ভালোবাসা, এতো সম্মান।
সামির সাথে প্রথম পরিচয়ের ঘটনাটা এখনো মনে আছে মনির উদ্দিনের। মাঝে মাঝে সে বিকেলের কথা মনে করে পুলকিত হয়। এত ভাল একটা মানুষের সাথে পরিচয়ের কথা মনির উদ্দিনের ভোলাবার কারন নেই।
সেদিন মনির উদ্দিনের ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিলনা। সেই দুপুর একটায় রিক্সা নিয়ে বের হয়েছে অথছ একটা পেসেঞ্জার পায়নি এখনো। তাকে আবার রাত ১০ টায় রিক্সা জমা দিতে হবে। জমার টাকা তো দূরে থাক একটা খ্যাপ এখনো পায় নি সে।
প্রথম দিকে একজন বুড়া কিসিমের মানুষ রিক্সা ভাড়া করতে আসছিল, বন্দর থেকে পাঠানটুলা যাবে।
সে ভাড়া চেয়েছিল ৪০ টাকা, বুড়া মানুষটা বলল- ১৫ টাকায় যাবা?
কথাটা শুনে মনির উদ্দিনের মাথায় রক্ত উঠে গেল। দিন দিন মানুষের বিবেক বুদ্ধি লোপ পাচ্ছে- এই ধারনা আরও বদ্ধমূল হল তার মনে। সে রিক্সার সিটে বসে জামার পকেট থেকে একটা আধা খাওয়া বিড়ি বের করে ধরাতে ধরাতে বলল- না যামু না।
বুড়া মিয়া তাকে অবাক করে দিয়ে বলল- তাহলে চল ৪০ টাকাতেই চল।
মনির তার বিড়িতে খুব জোরে একটা টান দিয়ে বলল- না তাও যামু না। আপনে অন্য রিক্সা দেখেন। বলেই আয়েশ করে পা তুলে বিড়ি টানতে লাগলো। মনির উদ্দিন যখন যাবে না বলেছে শুনে বুড়া মিয়ার চেহারা দেখার মত হয়েছিল, মনে মনে মনির উদ্দিন খুশি হল। টাকা দিয়া সব পাওন যায় মনির উদ্দিনকে পাওয়া যায় না। মনির উদ্দিনের রিক্সা এত সস্তা না।
কিন্তু এই বিকেলে এসে মনে হল তার কাজটা ভুল হয়ে গেছে, দিনের প্রথম ভাড়া লক্ষ্মী, যা দেয় তাই হাসি মুখে নিতে হয়। লক্ষ্মীকে কষ্ট দিলে লক্ষ্মী মুখ ফিরিয়ে নেয়। মনে মনে মনির উদ্দিনের আফসোসের সীমা রইল না। যাই হোক সে দ্বিতীয় লক্ষ্মীর অপেক্ষা করছে, পরের যে কাস্টমার আসবে তাকে বিনা ভাড়ায় নিয়ে যাবে সে, এটা মনির উদ্দিনের ওয়াদা। মনির উদ্দিনের ওয়াদার মত শক্ত আর কিছু নেই। কিন্তু সেই ওয়াদার শক্ত ভাবটা কিছু ক্ষণ পরেই নরম হতে শুরু করে।
মনির উদ্দিনের মতে ওয়াদা মানুষ করেই ভাঙার জন্য। তার মতে শুধু ওয়াদা না মানুষ নিজ হাতে যাই তৈরি করুক না কেন সেটার গোপন উদ্দেশ্য ভাংচুর করা। এই যে সিলেট শহরে এত বড় বড় বাড়ি সব তৈরিই হয়েছে ভেঙ্গে ফেলার জন্য।
তৈরি আর ভাঙার মাঝের সময়টা মানুষ উপভোগ করে যেমন এখন মনির উদ্দিন উপভোগ করছে তার বিনা ভাড়ায় যাত্রি নেবার ওয়াদা।
যাত্রি যদি বলে- এই রিক্সা, পাঠানটুলা যাইবা?
মনির উদ্দিন উদাস গলায় বলবে- বসেন নিয়া যাই, ভাড়া লাগব না। আপনে হইলেন আমার দ্বিতীয় লক্ষ্মী, আমি লক্ষ্মীর কাছ থেকে ভাড়া নেই না।
একটু পরেই দেখে অল্প বয়সি একটা ছেলে সটান তার রিক্সায় বসে পড়ল, বলল ভাই, একটু তাড়াতাড়ি চলেন, লেট হয়া গেল। মনির কিছু না ভেবেই জোরে জোরে রিক্সায় প্যাডেল মারতে লাগলো, কিন্তু কোথায় যাবে তা তার অজানা। পেছন থেকে ছেলেটি বলে দিচ্ছিল, ডানে যান বামে যান। মনির উদ্দিন ভেবেছিল ছেলেটি বাস স্টেন্ড বা রেল স্টেশনে যাচ্ছে, কিন্তু গন্তব্য শেষে দেখতে পেলো কিছু ফুটপাতের ছেলে তার সাথে ফুটবল খেলার জন্য অপেক্ষা করছিলো। সে এখানে আশার সাথে সাথেই ছেলেগুলো উল্লাসে ফেটে পড়লো। এই ফুটপাতের ছেলেগুলোর সাথে কলেজ পড়ুয়া ভদ্র ঘরের ছেলের কেমনে বন্ধুত্ব হলো তা মনির উদ্দিন বুঝতে না পারলেও মানুষটিকে তার ভাল লেগে যায় তার পাগলামির জন্য। সেই ছেলেটিই সামি। এমন একজন মানুষকে কিভাবে ভুলে!!
প্রায় আড়াই মাস হলো সামির সাথে মনির উদ্দিনের দেখা নেই। আজ আগের দু একদিনের চেয়ে শীত একটু কম। বিকেল হয়ে গেলেও তেমন ঠান্ডা নেই। বন্দর বাজার এলাকায় রিকশা নিয়ে দাড়িয়ে ছিলো মনির উদ্দিন। পিছন থেকে কে যেনো বললো, মনির ভাই যাবা? সে আর কেউ না; মনির উদ্দিনের পরিচিত প্যাসেঞ্জার সামি।
কেনো জানি মনে হচ্ছে সামি আর আগের মতো নাই। মনির উদ্দিন অনেক কথা বললেও সামি কোনো উত্তর দিচ্ছে না। মনির উদ্দিন বললো কই যাইবেন?
এবার সামি উত্তর দিলোঃ সি ব্লক।
মনির উদ্দিন বুঝে গেলো সামি যাচ্ছে তার সেই বান্ধবীর বাসায়।
রিকশা সেখানে পৌছুলেও মনির উদ্দিনের আর বুঝতে বাকি রইলো না। সবকিছু আর আগের মতো নাই। নীল রংএর বাড়িটা ধুসর রংএর হয়ে গেছে। বাড়িটাতে হয়তো কিছু দিন আগেই আগুন লেগেছিলো। এই বাড়িতে এখন আর কেউ থাকেনা।
সামি বললো মনির ভাই তুমি একটু দাড়াও আমি ছাদ থেকে আসছি। মনির উদ্দিন প্রায় ১০ মিনিট অপেক্ষা করলো। কিছুক্ষন পর সামি ছাদ থেকে মাথা বের করে বললো, মনির ভাই, তুমি ছাদে আসো।
মনির উদ্দিন ইতঃস্তত করে রিক্সায় তালা মেরে ছাদে যায়। রিক্সা চুরি হবার ভয় অবশ্যই মনির উদ্দিনের আছে, কিন্তু সামিকে সে এত মান্য করে যে সে না গিয়ে থাকতে পারলোনা।
একবার মনির উদ্দিনের রিকশায় চড়ে সামি কোথাও যাচ্ছিলো। কিন্তু মাঝ পথেই ঝড় বৃষ্টির বাধা। সামি বললো, চল আজ সিলেট শহরের বৃষ্টিতে ভিজি।
তারপর দুইজন মিলে এই ঝড়ে রিক্সা নিয়ে ছুটলো, সামি রিক্সার হুড নামিয়ে ভিজলো, আর মনির উদ্দিন মনের সুখে উড়ে চলল সিলেটের রাস্তায়, ভার্সিটি এলাকায় গিয়ে দুজন মিলে চা খেলো। ঐ রাতেই মনির উদ্দিন ভয়াবহ জ্বরে পড়ে গেল, সিলেটে মনির উদ্দিনের কেউ নাই, সামি খোঁজ পেয়ে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়েছিল, সব খরচ দিয়েছিলো সামি। হয়ত তার জন্যই মনির উদ্দিনের উপর সামির প্রভাব বেশি।
ছাদে গিয়ে দেখে সামি একটা ছোট পিলারের উপর পায়ের উপর পা তুলে পশ্চিম দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সিগারেট টানছে। মনির উদ্দিন সামির পাশে গিয়ে দাঁড়াল, বলল- ভাইজান আমারে ডাকছেন?
সামি বলল, মনির ভাই, ছাদের ঐ কোনাটা দেখ, খুব সুন্দর না?
মনির উদ্দিন ছাদের কোনার কোন সৌন্দর্য দেখতে পেল না, শ্যাওলা ধরে কাল হওয়া দেওয়ালের নিচে কালচে ফ্লোর। সে বলল- হ ভাইজান, খুবই সুন্দর।
সামি হেসে বললো এই কোনায় আমার একটা স্মৃতি আছে, ফিওনা যখন এই বাসায় থাকতো, তখন ওর হাত ধরে আমি প্রায়ই এখানে বসে থাকতাম। ওর মনে অনেক কষ্ট ছিলো মনির ভাই, বুঝলা! কিছুই মুখে বলতো না। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রায়ই কেঁদে দিতো। আমি এই হাত দিয়ে মুছে দিতাম। আমি বুঝে ছিলাম ও আমার গভীর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলো। যেদিন ঘটনাটা ঘটে সেদিন আমি কলেজে ছিলাম। বিকেলে এসে দেখি বাসাটা দাউদাউ করে জ্বলছে।
মনির উদ্দিন জানতে চাইলো আপার কি হইছিলো?
সামি জবাব দিলো না। হঠাৎ করুন স্বরে বললো, জানো মনির ভাই সেই দিন থেকেই ফিওনা কাঁদছে। এই কোনায় বসে বসে কাঁদছে। মনির উদ্দিন হাতের উল্টোপিঠে চোখ মুছলো। (শেষ)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন