কল্পনার চোখে ভাবুন দৃশ্যটা! সবুজ জমিনে লাল সূর্য্যের মাঝখানটায় হলুদ মানচিত্র- পতপতিয়ে উড়ছে তখনো না জন্মানো একটি দেশের কাল্পনিক এক পতাকা। আর তা সদর্পে উচিয়ে মাঠ দাপাচ্ছেন একদল তরুণ। এরাও মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু হাতে বন্দুক নেই। জার্সি আর শর্টস পায়ে বুট পড়ে পতাকার মান রাখতে সারা ভারত জুড়ে খেলে বেড়াচ্ছে তারা। আমি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের কথা বলছি।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এদেশের সকল পেশার মানুষের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে তৎকালিন ফুটবল খেলোয়াড়দের অবদানও ছিল অবিস্মরণীয়। দেশকে শত্রুমুক্ত করার শপথ তাঁদের কন্ঠওে ধ্বনিত হয়েছিলো। দেশকে রক্ষার দৃঢ়, কঠিন প্রতিজ্ঞা নিয়েই দেশের একঝাঁক তরুণ ফুটবলার গঠন করেছিলেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল।
১৯৭১ সালে বিদেশের মাটিতে ফুটবলাররাই বাংলাদেশের পতাকা প্রথম উত্তোলন করেন।
আইডিয়াটা শামসুল হকের মাথা থেকে বেরিয়েছে। জুনের সেই দূরন্ত দিনগুলোতে কলকাতায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি এবং সিদ্ধান্ত নেন একটি ফুটবল দল গঠনের যারা সারা ভারতজুড়ে খেলে সমর্থন আদায় করবে আমাদের স্বাধীন বাংলার স্বীকৃতির জন্য। তার সাহায্যে এগিয়ে এলেন সমিতির প্রথম সেক্রেটারি লুতফর রহমান, কোচ আলী ইমাম ও ইস্ট এন্ড ক্লাবের সাবেক ফুটবলার সাঈদুর রহমান প্যাটেল।
তাদের তৎপরতায় ভারতের আকাশবানীতে একটি বিবৃতি প্রচার হলো যাতে পূর্ব পাকিস্তানের সমস্ত ফুটবলারকে যোগ দিতে বলা হলো একটি বিশেষ ঠিকানায়। ঘোষণা দিতে বাকি, কদিনে মধ্যেই কোচ ননী বসাকের (চলচ্চিত্র অভিনেত্রী শবনমের বাবা) বিশেষ ৩০ জনের মতো খেলোয়াড় ট্রায়ালে যোগ দিলেন। তাদের মধ্যে থেকে ২৫ জনকে বাছাই করা হলো। পরে অবশ্য ভারত সফরে আরো বেশ কজন খেলোয়াড় দলে যোগ দেন। পার্ক সার্কাস এভিন্যুর কোকাকোলা বিল্ডিংয়ের একটি রুমে থাকতেন ফুটবলাররা। আর প্র্যাকটিস করতেন পাশের মাঠেই।
পরবর্তীতে আট নম্বর থিয়েটার রোডের কার্যালয়ে ১৩ জুন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন প্যাটেলের হাতে তুলে দিয়েছিলেন ১৪ হাজার ভারতীয় রুপি। ওই অর্থ স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গড়ে তোলার পথ সুগম করেছিল।
২৫ জুলাই নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর স্টেডিয়ামে প্রথম ম্যাচ খেলে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। খেলার আগে জাতীয় পতাকা উত্তোলন নিয়ে আপত্তি ছিল। কিন্তু খেলোয়াড়দের দাবির মুখে সে আপত্তি টেকেনি। বিদেশের মাটিতে ফুটবলাররাই বাংলাদেশের পতাকা প্রথম উত্তোলন করেন। কৃষ্ণনগরের ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হয়। গোল করেছিলেন শাহজাহান এবং এনায়েত।
সাবেক বিসিবি ম্যানেজার তানভির মাজহার ইসলাম তান্না ছিলেন দলটির ম্যানেজার। তার ভাষায়, ‘ভারতের যেখানেই গিয়েছি আমরা, প্রচণ্ড সাড়া পেয়েছি সাধারণ মানুষের।’ অধিনায়ক পিন্টুর ভাষায়, ‘এই ঘটনার পর প্রতিপক্ষ আর অফিসিয়াল নাম ব্যবহার করতে পারেনি। এমনকি মোহনবাগান খেলেছে গোষ্টপাল একাদশ নামে।'
সর্বশেষ খেলাটি অনুষ্ঠিত হয় মুম্বই তে যেখানে মহারাষ্ট্র ফুটবল দলের নেতৃত্ব দেন ভারতের খ্যাতনামা সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক নবাব মনসুর আলি খান পতৌদি।
অধিনায়ক পিন্টু জানিয়েছিলেন, ' মজা হয়েছিল মুম্বাইয়ে- মহারাষ্ট্র একাদশের হয়ে খেলেছিলেন স্বয়ং নবাব মনসুর আলী খান পতৌদি ( অভিনেতা সাইফ আলী খানের পিতা) এবং আমাদের বিপক্ষে একটি গোলও করেন। আমার এখনো চোখে ভাসে স্বয়ং দিলীপ কুমার এসেছিলেন ম্যাচটি দেখতে এবং এক লক্ষ রুপি অনুদানও দেন দলকে।’
ভারতের বিভিন্ন স্খানে ঐ সকল খেলোয়াড়রা প্রায় ১৬টি প্রদর্শনী ম্যাচে নিজের কৌশল প্রদর্শনের মাধ্যমে জনগণকে বুঝাতে সক্ষম হলেন বাংলাদেশের তৎকালীন যুদ্ধের যথাযর্থতাকে।
দিল্লীতে একটি ম্যাচ খেলতে যাবার ঠিক আগে এল অসাধারণ খবরটি- বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। সেদিন ছিল ১৬ ডিসেম্বর।
১৬টি খেলার মধ্যে এই দল ১২টি খেলায় জয়লাভ করে এবং বাকি ৪টির ৩টিতে পরাজয়, ১টিতে ড্র হয়। এইসব ম্যাচ খেলে ভারতীয় মুদ্রায় ৩ লক্ষ টাকা তুলে তৎকালীন বাংলাদেশের অস্খায়ী সরকারের কাছে দেয়া হয়েছিল।
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল যারা অংশ নেন তারা হলেন:
১ম সভাপতিঃ শামসুল হক, প্রাক্তন মন্ত্রী
২য় সভাপতিঃ মরহুম আশরাফ আলী চৌধুরী
৩য় সভাপতিঃ এন এ চৌধুরী (কালু ভাই)
ম্যানেজারঃ তানভির মাজহারুল ইসলাম তান্না
কোচঃ ননী বসাক
অধিনায়কঃ মো: জাকারিয়া পিন্টু
সহ-অধিনায়কঃ প্রতাপ শংকর হাজরা
কাজী সালাহউদ্দিন (বর্তমান বাফুফে সভাপতি), নওশেরউজ্জামান, লেঃ নুরুন্নবী, তাসলিম, আইনুল হক, খোকন , লুৎফর, শেখ আশরাফ আলী, অমলেশ সেন, হাকিম, আমিনুল ইসলাম সুরুজ, বিমল, সুভাষ চন্দ্র সাহা, মুজিবর রহমান, কায়কোবাদ, ছিরু, সাত্তার, সনজিৎ, মোমেন জোয়ার্দ্দার, সাঈদুর রহমান প্যাটেল, পেয়ারা, এনায়েতুর রহমান খান, শাহজাহান, অনিরুদ্ধ, নিহার, গোবিন্দ কুন্ডু, প্রয়াত আলী ইমাম, প্রয়াত লালু, প্রয়াত মাহমুদ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন