সোমবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৭

একজন ভাঙ্গা বুদ্ধিজীবী, ব্রোকেন ইন্টেলেকচুয়াল

১৯৭১ সালের মে মাসের কোন এক দিনে। একজন পাগলাটে লোককে কলকাতার রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গিয়েছিলো। তাঁর পরনে ধুলিমলিন পাজামা-পাঞ্জাবি। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। এক মাথা এলোমেলো চুল। মুখে খোঁচা খোঁচা। সে মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম।
তাঁর পিছনে একটা কালো রঙের বিশাল ব্যানার। তাতে বড় বড় করে সাদা অক্ষরে বাংলা এবং ইংরেজিতে লেখাঃ “বাংলা দেশের শরনার্থীদের জন্য দান করুন।” ফুটপাতের লোকজন যেতে যেতে দাঁড়িয়ে পড়ছে। অনেকেই টাকাপয়সা দিচ্ছে। রেলিং ঘেঁষে একটা বড় বাক্স । লোকজন টাকাপয়সা ওই বাক্সেই ফেলছে।
বাক্সের পাশেই লম্বা একটি টুল। তার ওপর গিটার হাতে এক বিদেশি তরুণ বসে আছে। গায়ের রং তামাটে । হিপিদের মতো লম্বাচুল, চোখে সানগ্লাস। মুখ ভরতি লালচে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। পরনে ঢোলা বেলবটম প্যান্ট আর রঙীন হাওয়াই শার্ট। মাথায় একটি সাদা রঙের সোলার হ্যাট। গিটার আর মাউথ অর্গান বাজিয়ে তরুণটি গাইছে:
Come senators, congressmen Please heed the call Don't stand in the doorway Don't block up the hall.
ঠোঁটে পাতার বিড়ি আর হাতে বাংলা মদের বোতল। মাথাভর্তি উদভ্রান্তের মত এলোমেলো চুল, ক্ষুরের স্পর্শাভাবে গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। পরনে ধুলিমলিন পাজামা-পাঞ্জাবীর সাথে কাঁধে একটা শান্তিনিকেতনী ঝোলা। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, সে চোখে কৌতুক মেশানো ধারালো দৃষ্টি। যিনি মানুষের কথা ভাবতেন। মানুষের কাছে পৌঁছুতে চাইতেন।




'তিনি কে' এই প্রশ্ন কেউ করলে কোনরকম হেঁয়ালী না করেই সরাসরি জবাব দিয়ে দিয়ে দিতেন- 'আমি এক মাতাল। ভাঙ্গা বুদ্ধিজীবী, ব্রোকেন ইন্টেলেকচুয়াল'। এই হল কিংবদন্তী চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটকের লেন্সের ভেতর দিয়ে নিজেকে দেখার উপলব্ধি।
অযাত্রিক, বাড়ি থেকে পালিয়ে, তিতাস একটি নদীর নাম, মেঘে ঢাকা তারা, সুবর্ণরেখার মতো কালজয়ী সিনেমা তৈরি করলেও তিনি আসলে পরিচালক হতে সিনেমা বানাতেন না। সিনেমা বানাতেন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য। নিজের বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছাতে।
তাই তো তিনি বলতেন, ‘ছবি লোকে দেখে। ছবি দেখানোর সুযোগ যতোদিন খোলা থাকবে, ততোদিন মানুষকে দেখাতে আর নিজের পেটের ভাতের জন্য ছবি করে যাবো। কালকে বা দশ বছর পরে যদি সিনেমার চেয়ে ভালো কোনো মিডিয়াম বেরোয় আর দশবছর পর যদি আমি বেঁচে থাকি, তাহলে সিনেমাকে লাথি মেরে আমি সেখানে চলে যাবো। সিনেমার প্রেমে মশায় আমি পড়িনি। আই ডু নট লাভ ফিল্ম।’

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন